Press ESC to close

‘নিজের সবটুকু নিংড়ে দিয়ে মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছি’

জীবনানন্দ দাশের ভাষায় বলতে হয়, ‘প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়।’ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর আজ তেমনি একদিন। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলার দিন। সামাজিক মাধ্যমে এক ভিডিও পোস্ট দিয়ে দীর্ঘ ২৩ বছরের পথচলা থামিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ৫ বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী।

নিচে রোনালদোর বিদায়ী ভাষণ হুবহু তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য—

‘পর্তুগিজদের উদ্দেশে, জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। এই জার্সিকে কখনোই শুধু নিজের সম্পত্তি মনে করিনি। তবে ২৩ বছর ধরে পরা জার্সিটির মর্যাদা রক্ষা করার এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের স্টেডিয়ামে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব আমার হয়েছে। আজ সময় এসেছে জার্সিটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার।

সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। কারণ কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়েও নিতে হয়। ২০০৩ সালের আগস্টে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তার সমাপ্তি ঘটছে। এই যাত্রা আমার জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছে।

পেছনে ফিরে জাতীয় দলের হয়ে কাটানো দিনগুলোর কথা ভাবলে শুধু ম্যাচ, গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে মানুষগুলোর কথা। মনে পড়ে প্রবাসীদের কথা, যারা ৯০ মিনিটের জন্য হলেও পর্তুগালকে নিজেদের একটু কাছাকাছি অনুভব করতেন। মনে পড়ে লাখো পর্তুগিজের কথা, যাদের সঙ্গে কখনো ব্যক্তিগতভাবে দেখা হয়নি, অথচ তারা আমার জীবনের অংশ হয়ে ছিলেন।

কারণ দিন শেষে ফুটবল একটি খেলার চেয়ে অনেক বড়। ফুটবল মানে মানুষ, ফুটবল মানে মানুষের আবেগ।

জাতীয় দলের হয়ে পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। চেয়েছি জিততে, সেরা হতে, ইতিহাস গড়তে। নিজের কাছে সব সময়ই কঠোর ছিলাম। সব সময় আরও বেশি কিছু চেয়েছি। বিশ্বাস করেছি, আমরা আরও দূরে যেতে পারি। এই জার্সির জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি।

কিছু বিকেল ও রাত ছিল স্বপ্নের মতো। এমন কিছু জয় পেয়েছি, যা কখনো ভুলব না। আবার এমন কিছু হারও আছে, যা আজও মনে পড়লে কষ্ট হয়। আমিও ব্যর্থ হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি। এমন মুহূর্তও এসেছে, যখন পর্তুগিজদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি। কিন্তু কখনো হাল ছাড়িনি। সবচেয়ে বড় কথা, পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব কখনো হারাইনি।

এত বছরের পথচলায় খুব সাধারণ কিছু বিষয় শিখেছি। গোলের স্মৃতি একসময় ফিকে হয়ে যায়, ট্রফি জাদুঘরে ঠাঁই পায়, রেকর্ডও একদিন ভেঙে যায়। কিন্তু একটি বিষয় সময় কখনো মুছে দিতে পারে না—মানুষের হৃদয়ে আমাদের জায়গা।

যদি কখনো আপনাদের আনন্দ দিতে পেরে থাকি, আমার কোনো একটি গোলে যদি আপনারা কাউকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ পেয়ে থাকেন, কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজেদের দুশ্চিন্তা ভুলে গিয়ে দেশের জন্য গর্ব অনুভব করে থাকেন, তাহলে আমার সব পরিশ্রম সার্থক।

কারণ পর্তুগিজ হওয়ার অর্থও তো এটাই। আমরা একসঙ্গে কষ্ট পাই, একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াই, আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখি।

পর্তুগালের সব সময় এমন তরুণদের প্রয়োজন, যারা স্বপ্ন দেখতে জানে। এমন খেলোয়াড়দের প্রয়োজন, যারা কখনো হাল ছাড়ে না। এমন নতুন প্রজন্ম দরকার, যারা বিশ্বাস করে—যেখানে কেউ কখনো পৌঁছাতে পারেনি, সেখানেও পৌঁছানো সম্ভব। কারণ যে দেশ নতুন নতুন বীরের জন্ম দিতে থাকে, সেই দেশ কখনো নিজের ওপর বিশ্বাস হারায় না।

জাতীয় দলের সতীর্থদের জন্য বিশেষ কিছু কথা বলতে চাই। প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি আলিঙ্গন, প্রতিটি তর্ক, মাঠে নামার আগের প্রতিটি নীরব মুহূর্ত, একসঙ্গে উদ্‌যাপন করা প্রতিটি জয় এবং আমাদের আরও শক্তিশালী করে তোলা প্রতিটি হারের জন্য ধন্যবাদ।

তোমাদের অধিনায়ক হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু কোনো অধিনায়ক একা পথ চলতে পারে না। তোমরা প্রত্যেকেই আমার গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গত এতগুলো বছর আমার সঙ্গে কাজ করা সব কোচ, কর্মকর্তা, চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, সরঞ্জাম ব্যবস্থাপক, কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। তোমাদের অনেকেই কখনো ছবিতে জায়গা পাওনি। কিন্তু তোমাদের ছাড়া সেই ছবিগুলোর কোনোটি তোলা সম্ভব হতো না।

আমার পরিবারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা। আমার অনুপস্থিতি, ত্যাগ এবং এমন অনেক মুহূর্তের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, যখন জাতীয় দলকে সময় দিতে গিয়ে তোমাদের প্রাপ্য সময়টুকুও দিতে পারিনি। আমি এত দূর আসতে পেরেছি, কারণ তোমরা সব সময় আমার পাশে ছিলে।

আর বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সব পর্তুগিজের উদ্দেশে শেষবারের মতো একটি কথা বলতে চাই।

একটি দৃশ্য সব সময় আমার হৃদয়ে থেকে যাবে। জাতীয় সংগীত শুরু হওয়ার মুহূর্তটি। চারপাশে তাকিয়ে দেখি সতীর্থদের, গ্যালারিভর্তি দর্শকদের, শিশুদের, মায়েদের, বাবাদের, দাদা-দাদিদের। দেখি, শুধু সেখানে উপস্থিত থাকার জন্য কত দূর থেকে ছুটে এসেছে মানুষ।

সেই কয়েকটি মিনিটে আমরা আর আলাদা থাকি না। সেখানে কোনো ক্লাব নেই, কোনো আলাদা রং নেই, শ্রেণি নেই, পেশা নেই, মতের ভিন্নতা নেই। থাকে শুধু একটি আবেগ, একটি ভালোবাসা।

পর্তুগাল মানে এই অনুভূতি। জীবনের বাকি সময়টুকু এই অনুভূতিই বয়ে বেড়াব।

আজ জাতীয় দলের হয়ে মাঠের ভেতরে আমার পথচলা শেষ হচ্ছে। মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছি। নিজের পথচলার জন্য গর্বিত। এই বিশ্বাস নিয়েই বিদায় নিচ্ছি যে, পর্তুগালের জন্য নিজের সবটুকু দিয়েছি।

তবে কখনোই আপনাদের একজন হওয়া বন্ধ করব না। পর্তুগালের প্রতিটি ম্যাচে আগের মতোই কষ্ট পাব, উচ্ছ্বাসে মাতব এবং প্রতিটি জয় উদযাপন করব।

সারা জীবন বিশ্বের সেরা ফুটবলার হওয়ার জন্য পরিশ্রম করেছি। আজ বুঝতে পারছি, সবচেয়ে বড় জয় ছিল বিশ্বের সেরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা অর্জন করা।

এই ২৩ বছরের জন্য ধন্যবাদ। আমার ওপর বিশ্বাস রাখার জন্য ধন্যবাদ। ছোট্টবেলায় মাদেইরার রাস্তায় বলের পেছনে ছুটে বেড়ানো যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা বাঁচার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

সাত নম্বর জার্সিটি থেকে যাবে। আর এই জার্সি গায়ে জড়ানোর গর্ব আমার হৃদয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।

পর্তুগাল সব সময় আমার হৃদয়ে থাকবে।

বিদায়, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো।’

logo

শরীরচর্চার জন্য মাঠ আর মনের প্রশান্তির জন্য খেলার সংবাদ।
শুধুমাত্র খেলাধুলা বিষয়ক ফিচার ও নিউজ এর জন্য খেলার কলাম একটি অনন্য প্লাটফর্ম। এছাড়াও বিভিন্ন স্পোর্টেইনমেন্ট কন্টেন্টের জন্য জনপ্রিয় সকল সোশ্যাল মিডিয়ায় খেলার কলামের ব্যাপ্তি রয়েছে। ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস ও অন্যান্য সকল খেলাধুলার আপডেট খবরাখবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়ায়।