
বাবা হারিয়ে স্তব্ধ লিওনেল মেসি। গত ৮ আগস্ট হোর্হে মেসি পরপারে পাড়ি জমানোর পর থেকেই নিশ্চুপ ছিলেল আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। আসলে প্রিয় মানুষকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আবেগকে আর চেপে রাখতে পারলেন না ৮ বারের ব্যালন ডি অর জয়ী।
বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণের সঙ্গে অনেক অব্যক্ত কথা, যা আর কখনোই বলার সুযোগ পাবেন না তিনি, সে সব কথা এক খোলা চিঠিতে জানালেন মেসি। সামাজিক মাধ্যমে করা মেসির স্প্যানিশ ভাষার বার্তা পাঠকদের জন্য নিচে হুবহু অনুবাদ করে তুলে ধরা হলো—
‘‘বাবা, এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না তুমি আর নেই। কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। সত্যি বলতেমেনে নিতেই চাইছি না। ভাবতেই ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, তোমাকে আর কোনো দিন দেখতে পাব না, তোমার সঙ্গে আর কথা বলতে পারব না। জানি, তুমি অনেক কষ্ট পাচ্ছিলে এবং তোমার চলে যাওয়াটাই হয়তো ভালো হয়েছে। কিন্তু তুমি খুব দ্রুতই চলে গেলে । আরও অনেক কিছুই একসঙ্গে উপভোগ করার বাকি ছিল।
তুমি কতবার বলেছিলে, আমি যেন ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটা খেলি। অথচ বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক দিন আগে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়লে। এই প্রথম আমার কোনো টুর্নামেন্টে তুমি উপস্থিত থাকতে পারলে না। তবে মা বলেছিল, তুমি ভালো হয়ে উঠবে, ঠিক হয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত ভ্রমণ করে আসতে পারবে। আমিও তোমাকে বলতাম, আমরা ফাইনালে উঠব, তখন এসে আমাদের খেলা দেখতে পারবে।
প্রতিটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর অপেক্ষায় থাকতাম— কখন তোমার মেসেজ আসবে। মেসেজ না পাওয়ায় বুঝতে পারলাম, পরিস্থিতি সত্যিই ভয়াবহ। যতটা সম্ভব এগিয়ে যাওয়ার কথাই ভাবতাম, যাতে তোমার হাতে একটু সময় থাকে, আর তুমি অন্তত একটি ম্যাচ দেখতে পারো।
আমরা ফাইনালে উঠলাম কিন্তু তুমি আর আসতে পারলে না। চেয়েছিলাম ফাইনালটা জিতে ট্রফিটা নিয়ে গিয়েতোমাকে দেখাব। পারলাম না। আমার পা আর চলছিল না। এবার নিজের শরীরের সঙ্গেই লড়াই চলল, শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অগ্রাহ্য করে চেষ্টা করলামকিন্তু পারিনি। কোনো সময়ই নিজেকে পুরোপুরি সুস্থ বা স্বস্তিতে মনে হয়নি।
যখন ফিরে এলাম, তুমি তখনও মনে করছিলে আমরা হয়তো পেনাল্টিতে ফাইনাল হেরেছি। বিশ্বকাপে যা ঘটেছে, সেসব নিয়ে তোমার সঙ্গে কোনো কথাই হলো না। কিছুই উপভোগ করতে পারলে না। চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি, কিন্তু তুমি জানো না, প্রতিটি ম্যাচ কতটা উপভোগ করেছি আমরা। আরেকবার তোমার কথাই ঠিক হলো আমার সেখানে থাকা এবং খেলা উচিত।
তোমাকে এতসব বলছি, এই একটিমাত্র বিষয় নিয়েই আমাদের আর কথা বলা হলো না। বাকি সবকিছু তোমার জানা। ব্যস্ততার ফাঁকে সুযোগ পেলেই আমরা প্রতিদিন কথা বলতাম, দেখাও করতাম।
তোমাকে ছাড়া কীভাবে এগিয়ে যাব বুঝতে পারছি না। আমি তো শুধু ফুটবল খেলতেই জানতাম। কিন্তু এখন নিজেরই সন্দেহ হচ্ছে, আর কত দিন ফুটবলটা খেলতে পারব। শুরু থেকেই আমার পাশে ছিলে। শেষটা আসতে আর এতটুকুই তো বাকি ছিল। আর একটু কেন অপেক্ষা করলে না, একসঙ্গে শেষটা করতাম।
জানি, তোমার সবচেয়ে বড় খুশি ছিল তোমার পরিবারকে ভালো থাকতে দেখা—তোমার স্ত্রী, তোমার সন্তানদের। আর সবকিছুর আড়ালে আমাকে খেলতে দেখা।
ছোটবেলা থেকেই তো এমনটাই ছিল। কাজ থেকে ফিরেই আমাকে নিয়ে ছুটতে অনুশীলনে। তুমি কাজে ব্যস্ত থাকলে অনেক সময় মা আমাকে নিয়ে যেত।
কিন্তু কখনো আমার ম্যাচ মিস করতে না। আমাকে খেলতে দেখে তুমি কতটা দুশ্চিন্তা করতে, আবার একই সঙ্গে কতটা আনন্দও পেতে! যদিও আমার প্রশংসা করতে কখনোই খুব একটা উদার ছিলে না।
তুমি ছিলে আমার বাবা, আমার বন্ধু, আমার প্রতিনিধি। প্রতিটি মুহূর্তে যে মানুষটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল, তুমি ঠিক তাই হয়েছিলে। আর কোনো ক্ষেত্রেই তুমি ভুল ছিলে না। আমাদের মধ্যে কিছু অভিমান, কিছু ঝগড়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তুমিই সঠিক ছিলে। শেষমেশ সবকিছুই তোমার বলা পথেই ঘটত।
তোমাকে ভীষণ মিস করব। কিন্তু তুমি সবসময় আমার সঙ্গেই থাকবে। বিশেষ করে আমার সন্তানদের মানুষ গড়ার পথে। তোমাদের দেখানো পথেই আমি তাদের শেখাচ্ছি এবং বড় করছি।
শান্তিতে ঘুমাও, বাবা। ওপার থেকেও আমাদের আগলে রেখো। যেমনটা এখানে করতে। সবকিছুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।
তোমাকে ভালোবাসি বাবা।’’

